এক পাশে বসেছিলেন ক্যানসারে আক্রান্ত স্বামী-সন্তানহীন গীতা চৌধুরী। রোগে ভুগতে ভুগতে তাঁর শরীরের ওজন নেমে এসেছে মাত্র ২১ কেজিতে। অর্থের অভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পরবর্তী কেমোথেরাপি। অন্য পাশে দুই থ্যালাসেমিয়া-আক্রান্ত শিশুকে বাঁচানোর আকুতি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের বাবা। প্রতি মাসে দুই সন্তানের শরীরে চার ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। চিকিৎসায় খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
কেউ এসেছিলেন ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসার আবেদন নিয়ে, কেউ দুর্ঘটনায় আহত সন্তান ও অসুস্থ বাবাকে বাঁচাতে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার আকুতি নিয়ে।
বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে এক কক্ষে মিলেছিল অসহায় মানুষের এমন অনেক কষ্টের গল্প। প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শুধু আবেদন গ্রহণ বা আশ্বাস দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। আবেদনকারীদের অবস্থা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
মানবিক বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে মানুষের কাছে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জাহিদুল ইসলামের গণশুনানিতে আসা প্রত্যেকের জীবনেই ছিল বেঁচে থাকার আলাদা লড়াই।
মীরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের চরশর গ্রামের অমল বড়ুয়ার দুই সন্তান চৈতী বড়ুয়া ও সুশান্ত বড়ুয়া। তাদের বয়স যথাক্রমে আট ও ছয় বছর। জন্মগতভাবে দুজনই এইচবিই-বিটা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত।
প্রতি মাসে তাদের শরীরে মোট চার ব্যাগ রক্ত সঞ্চালন করতে হয়। রক্ত, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসায় মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগে। সীমিত আয়ের অমল বড়ুয়ার পক্ষে এই ব্যয় বহন করা এখন প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে শিশু দুটি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
‘অর্থ নয়তো মৃত্যু’—এমন কঠিন বাস্তবতার কথা জানিয়ে সন্তানদের বাঁচাতে জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা চান অমল। তাঁর কথা শুনে শিশু দুটির চিকিৎসায় তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
স্বামী ও সন্তানহীন গীতা চৌধুরীর স্থায়ী বাড়ি বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠপুরায়। প্রায় ১৯ বছর ধরে তিনি নগরের বলুয়ার দিঘির পূর্ব পাড়ে অন্যের আশ্রয়ে বসবাস করছেন। চার বছরের বেশি সময় ধরে তিনি বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। ২০২৩ সালে তাঁর জরায়ুতে অস্ত্রোপচার করা হয়। বর্তমানে তিনি মেরুদণ্ডের ক্যানসার ও অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন।
গত ৩০ এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি থেকে প্রথম কেমোথেরাপি নিয়েছেন গীতা। কিন্তু দ্বিতীয় কেমোথেরাপির অর্থ তাঁর নেই। নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জেলা প্রশাসক তাঁর কথা ধৈর্যসহকারে শুনে চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন।
সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ ঘোড়ামারা এলাকার মো. আলাউদ্দিন এসেছিলেন বাবা মো. আমিনুল হকের চিকিৎসার আবেদন নিয়ে। তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। সাত সদস্যের পরিবারে আলাউদ্দিনই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার চিকিৎসা, সংসারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করতে গিয়ে তিনি দিশাহারা। তাঁর বাবার চিকিৎসা চালিয়ে নিতেও সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
নগরের ষোলশহর থেকে এসেছিলেন ফেরদৌস বেগম। তাঁর সন্তান ইরফান জন্ম থেকেই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হলেও আর্থিক সংকটে তা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই মা। ইরফানের চিকিৎসায়ও তাৎক্ষণিক সহায়তার হাত বাড়ান জাহিদুল ইসলাম।
কমিশনারের কার্যালয়, চট্টগ্রাম বিভাগে অফিস সহায়ক মো. আহসান উল্লাহর পরিবারে আটজন সদস্য। জ্যেষ্ঠ কন্যার বিয়ে দিতে গিয়ে তিনি প্রায় সাত লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে তাঁর বৃদ্ধ বাবা মসজিদে পড়ে আহত হয়েছেন এবং গত ২ জুন পুত্রও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। বাবা ও ছেলের চিকিৎসা চলছে। নিজেও বিভিন্ন রোগে ভুগছেন আহসান। তাঁর সংকটের কথা শুনে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা দেন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নেজারত শাখার জারিকারক মো. শেখ ফরিদ গত ১৮ জুন পিত্তথলিতে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় সংকটে পড়েছেন তিনি। তাঁর চিকিৎসা ব্যয়েও সহযোগিতা করেন জেলা প্রশাসক।
গণশুনানিতে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মো. মুবারক হোসেন। দিনমজুর বাবার ছয় সদস্যের পরিবার থেকে উঠে আসা মুবারকের ব্রেইল বই, রাইটিং ফ্রেম, ব্রেইল কাগজ, ল্যাপটপ ও শ্রুতলেখকের সম্মানীসহ পড়াশোনায় বাড়তি ব্যয় হয়। অর্থের অভাবে তাঁর উচ্চশিক্ষা যেন থেমে না যায়, সে জন্য তাঁকেও তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
শারীরিক প্রতিবন্ধী মো. মিজানুর রহমান হাঁটতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে বুকের সমস্যায় ভুগলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসকের দেওয়া পরীক্ষা করাতে পারছেন না। তাঁর চিকিৎসার জন্যও সহায়তা দেন জাহিদুল ইসলাম।
গণশুনানিতে জেলা প্রশাসক প্রত্যেক আবেদনকারীর পারিবারিক অবস্থা, চিকিৎসা ও প্রয়োজন সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নেন। শুনানি শেষে কেউ চিকিৎসার অর্থ, কেউ সন্তানের জীবন বাঁচানোর আশ্বাস, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সাহস নিয়ে ফিরেছেন। তাঁদের কাছে দিনটি ছিল বিপদের সময়ে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে পাশে পাওয়ার এক মানবিক অভিজ্ঞতা।