একটি সংবাদ শিরোনামই বদলে দিল জেলে পরিবারের ভাগ্য। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার তাৎক্ষণিক উদ্যোগে হাসপাতালের বকেয়া বিল মওকুফ পেয়ে ঘরে ফিরল পাঁচ মাস বয়সী শিশু জয়া দাস।
বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৪ মিনিটে সরকারি বাসভবনে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন জেলা প্রশাসক। ফাইলের ফাঁকে মোবাইলে চোখ বুলাতে গিয়ে থেমে যান একটি শিরোনামে—“আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার দিয়েছি, তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।”
খবরটি ছিল চট্টগ্রামের জিইসি এলাকার এশিয়ান স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু জয়া দাসের। হামে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন আইসিইউ ও কেবিনে থাকা জয়ার চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩০২ টাকা। জেলেপল্লীর বাসিন্দা বাবা সুমন জলদাস সঞ্চয়, স্ত্রীর গয়না বিক্রি ও ঋণ মিলিয়ে ৮০ হাজার টাকা জোগাড় করলেও বাকি ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩০২ টাকা পরিশোধের সামর্থ্য ছিল না।
সেদিন রাতেই জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন এবং নিজেই যোগাযোগ করেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম ও হাসপাতাল চেয়ারম্যান লায়ন আলহাজ্ব সালাউদ্দিন আলীর সঙ্গে।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আজ যদি আমার নিজের পরিবারের কোনো অসুস্থ শিশু চিকিৎসা শেষে শুধু অর্থের অভাবে আটকে যায়, তাহলে কেমন লাগত আমার?” প্রয়োজনে বকেয়া বিল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিশোধেরও আশ্বাস দেন তিনি।
হাসপাতাল চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলী তাৎক্ষণিকভাবে বলেন, “স্যার, আপনি বলেছেন—এটাই যথেষ্ট। বিল কোনো বিষয় নয়। আপনি সকালে হাসপাতালে আসুন, শিশুটিকে দেখেও যান।”
শুক্রবার সকালে জেলা প্রশাসক হাসপাতালে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বকেয়া ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩০২ টাকা মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়।
হাসপাতালের কক্ষে ঢুকে ছোট্ট জয়াকে দেখে জেলা প্রশাসকের প্রথম প্রশ্ন ছিল, “সকালে কী খেয়েছে জয়া? এখন ভালো আছ তো?” সেখানে ছিল না প্রশাসনিক প্রোটোকল, ছিল একজন অভিভাবকের স্নেহ।
চার ছেলের পর পাওয়া একমাত্র মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মা রীতা দাসের চোখে তখন স্বস্তির জল। জেলা প্রশাসক শুধু বললেন, “বাচ্চার জন্য ভালো খাবার কিনবেন, দুধ কিনবেন। পুষ্টিকর খাবার খাওয়াবেন।”
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় আবেগাপ্লুত সুমন জলদাস বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি ডিসি স্যার এসে আমার মেয়ের সব বিল এভাবে মওকুফ করে দেবেন। স্যার যদি সহযোগিতা না করতেন, তাহলে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো, মাইকিং করতে হতো। আমি হাসপাতালকে বলেছিলাম—আমি ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি, এর বেশি পারব না। মেয়ের জন্য জেলেও যেতে রাজি ছিলাম।”
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “রাত ১টা–২টাতেও জেলা প্রশাসক বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে যান। কোনো রোগী আর্থিক সংকটে পড়লে তিনি খবর নেন, কথা বলেন, সহযোগিতা নিশ্চিতের চেষ্টা করেন।”
চট্টগ্রামে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ইতিমধ্যেই ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত। জয়া দাসের পরিবারের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন একজন অভিভাবক।