• সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০১:০৫ পূর্বাহ্ন
Headline
নারায়ণগঞ্জে ‘বর্ষায় নজরুল’ অনুষ্ঠান উদযাপিত আইএইচআরসি ট্রাস্টের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি ঘোষণা: সভাপতি স্মৃতি, সম্পাদক হারুন মুন্সিগঞ্জে মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মীরকাদিম পৌর কমিটির সদস্যদের পরিচয়পত্র বিতরণ নারায়ণগঞ্জে ৩১ সদস্যের মহানগর কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন নারায়ণগঞ্জে শ্বেত পায়রার নতুন কমিটির সভাপতি মাসুমুল হক ও সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তার লাবণ্য সেহলী পারভীন-ই হিউম্যান এইড এর প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব —মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ভবনের ছাদ থেকেই শুরু হচ্ছে জেলা প্রশাসনের অভিযান: ডিসি জাহিদুল ইসলাম অপরাধ সম্মেলনে যোগ দিতে থাইল্যান্ডের পথে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির ডেঙ্গু প্রতিরোধে ডিসির নির্দেশে জেলা তথ্য অফিসের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সচেতনতামূলক সড়ক প্রচার নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয় জোরদারের তাগিদ ডিসি রায়হান কবিরের

টানা বৃষ্টিতে রেইনকোট পরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় খাবার ও খোঁজখবর  নিতে আশ্রয়কেন্দ্রে মানবিক ডিসি জাহিদ

এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ / ৬৪ Time View
Update : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

রাত তখন প্রায় আটটা। আকাশ যেন থামতেই চাইছে না। টানা বর্ষণে জলমগ্ন চারপাশ। রাস্তার ওপর জমে থাকা পানিতে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দের মধ্যেই রেইনকোট গায়ে, পায়ে গামবুট পরে কর্মকর্তাদের নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে যান সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে দায়িত্ব। কোথাও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলছেন, কোথাও পাহাড়ের পাদদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, আবার কোথাও আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে শিশু, নারী ও বয়স্কদের হাতে তুলে দিচ্ছেন শুকনো খাবার।

গত প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য পাহাড়ধসে প্রাণহানি এড়াতে এভাবেই মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
বুধবার রাতে লালখান বাজার সংলগ্ন পোড়া কলোনির ওয়াইডব্লিউসিএ কমিউনিটি স্কুল আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৬০ জন মানুষের মাঝে রাতের খাবার, মুড়ি, চিড়া, গুড়, কেক, বিস্কুট, বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার ও ওরস্যালাইন বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসক নারী, শিশু ও প্রবীণদের খোঁজখবর নেন এবং উপস্থিত স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
এর আগে মঙ্গলবার আকবরশাহ এলাকার ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল, বিজয়নগর ও শান্তিবাগ (পানির ট্যাংক এলাকা) পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ তদারকি করেন তিনি।
আশ্রয়কেন্দ্রে উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, গত প্রায় চার দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি স্বাভাবিক হলেও এবার বৃষ্টিপাত গত প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, “সবার আগে আপনার জীবন, আপনার সন্তানের জীবন। আমরা এই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। পাহাড়ধস হলে ঘরবাড়ি আবার বানানো যাবে, কিন্তু একটি প্রাণ চলে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না।”
দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কষ্টের কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি জানেন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার কারণে অনেকের কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই কষ্ট সাময়িক। অসতর্ক হলে একটি বড় দুর্ঘটনায় মূল্যবান জীবন হারাতে হতে পারে।
তিনি আশ্রিতদের উদ্দেশে বলেন, “এখানে থাকতে হয়তো কিছুটা কষ্ট হবে। কিন্তু সুন্দরভাবে বাঁচতে এই কষ্ট আমাদের মেনে নিতে হবে। আপনারা কেউ রাতের বেলা ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ফিরবেন না। এই বৃষ্টিতে কখন পাহাড়ধস হবে, কেউ বলতে পারে না। ঘুমিয়ে থাকতেই মাটি আপনার ওপর নেমে আসতে পারে।”
ঘরবাড়ি নিয়ে উদ্বিগ্নদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে পুরুষ সদস্যদের জন্য ছাতার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা গিয়ে বাড়ির অবস্থা দেখে আসতে পারেন। তবে নারী, শিশু ও বয়স্করা কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরে যাবেন না।
জেলা প্রশাসক বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। খাবারের কোনো সংকট হবে না। সবাই একটু ধৈর্য ধরুন। এই পরিস্থিতি কেটে গেলে আবার আপনারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, দুর্যোগের সময় প্রশাসনের পাশাপাশি গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থেকে মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরছেন, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়।
জেলা প্রশাসকের ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়া। দুর্যোগের সময় সবাই সবার পাশে দাঁড়াবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ৩৩ হাজার ৬৭৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৫ জন, আহত হয়েছেন ৫ জন।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদে রাখতে জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে ১ হাজার ২২২ জন মানুষ অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যে ১ হাজার ২১০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা মজুত রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা (এসওডি) অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জরুরি সভা সম্পন্ন হয়েছে। সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম এবং প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিন-রাত কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সোমবার রাত থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। আগাম সতর্কতা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির মাধ্যমে সম্ভাব্য পাহাড়ধসে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনাই এখন জেলা প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা