• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন
Headline
পরিবার পরিকল্পনা ও মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য অবদানে সদর উপজেলাকে জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা হিসেবে সম্মাননা প্রদান চীফ হুইপের সঙ্গে ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (ইপিডি) প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সহ জননিরাপত্তা নিশ্চিতে সকল অপরাধীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত ডিসির নৌবাহিনীর বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬’ উদ্বোধন করলেন নৌবাহিনী প্রধান কাজী নজরুল ইসলাম এর “অভিযান” কবিতার শতবর্ষ ও ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন নারায়ণগঞ্জ সদর কোর্টে অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. সায়ফুজ্জামান ফারুকী’র দ্বি-বার্ষিক পরিদর্শন নারায়ণগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রাজুয়েটস এসোসিয়েশনের মত বিনিময় রথযাত্রা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে জিরো টলারেন্স নীতি: এসপি মিজানুর রহমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন ও নেতাকর্মীদের উপর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর পানিবন্দী অসহায় মানুষের দুর্দশা লাঘবে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে মামবিক ডিসি জাহিদ

উৎসবের টানে বিষাদের ছায়া

বিদ্যুৎ টাইমস ডেস্ক / ৭৫ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

উৎসব এলেই মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ছুটে যায়। কিন্তু এই যাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবের আনন্দ থেকে বিষাদে পরিণত হয়। যানজট আর দুর্ঘটনায় যাত্রাপথে নেমে আসে চরম শোক এবং দুর্ভোগ। বেপরোয়া গতির সাথে দায়িত্বহীনতা, অসাবধানতা আর অসচেতনতায় ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ। দায়িত্ব যেখানে জীবনের সমান্তরাল, সেখানেই জমেছে অবহেলার পাহাড়। অস্থির উন্মাদনায় বিবেক আর বোধশক্তিযেন নীল আকাশে বিলীন। নিশ্চয়ই এ কান্না থামবে, এ আঁধার কাটবে আর বিবেকের আলোয় নিরাপদ হবে প্রতিটি প্রাণ।

উৎসবে কোটি মানুষের স্থানান্তর হয়। এই স্থানান্তরের সাথে মিশে আছে পরিবহন, চালক, মালিক আর সড়ক। নিয়ন্ত্রণহীন গতি, মুনাফা বা আর অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা এবং চালক-যাত্রী উভয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। কোন রাস্তায় কোন গাড়ির গতিবেগ কত হতে হবে কিংবা চালক একটানা কত সময় গাড়ি চালাবে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। গাড়ির গতির সর্বোচ্চ ক্ষমতা কিংবা সে গতি কতটুকু পরিসীমায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত শিক্ষার অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। গাড়ি বা রাস্তার বিষয়ে সাম্যক ধারণা ছাড়াই রাস্তায় ছুটে চলছে আপন গতিতে। রাস্তার নিয়ম আর নিয়ম মেনে চলার মতো অভ্যাস গড়ে উঠতে অনেকটা সময় লাগবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

উৎসবের সময়ে স্বাভাবিকভাবেই ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। আর অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের চাপ থেকেই অতিরিক্ত মুনাফা কিংবা অধিক আয় বৃদ্ধির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এই প্রতিযোগিতায় চালককে মালিকের প্রত্যাশা পূরণে মাত্রাতিরিক্ত গাড়ি চালাতে হয়। চালকের চাকরির নিশ্চয়তা আর মালিকের অধিক মুনাফা যেন একসূত্রে গাঁথা। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অতিরিক্ত ট্রিপ; আর অতিরিক্ত ট্রিপ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত গতি। অতিরিক্ত ট্রিপের ক্লান্তি দূর করতে অনেক সময় চালকের আসনে বসছে হেল্পার। এই অতিরিক্ত ট্রিপ আর অতিরিক্ত গতি হয়তো অতিরিক্ত মুনাফা আনছে, তবে তা জীবনের মতো অতি উচ্চমূল্য পরিশোধের বিনিময়ে। এভাবেই গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনার এক জটিল চক্র চলতে থাকে। এই চক্রে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন চালক। পরিবহন যেন টাকার মেশিন, আর চালকগণ হচ্ছেন সেই মেশিনের চাবি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা এর চালকের ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, তা মালিক-চালক কারও কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। অদক্ষ চালক অপরিচিত রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে নিঃসংকোচে বের হয়ে যাচ্ছে বিবেকের হাড়ি ফুটো করে। নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করা কিংবা নির্দিষ্ট গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট ড্রাইভার নিয়োজিত থাকার মতো সংস্কৃতি আজও আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গাড়ির স্টেরারিং এর হাত বদল যেন বিনিময় প্রথার উন্নত সংস্করণ। রাস্তায় পুরোপুরি বসে না পড়া পর্যন্ত গাড়ি গ্যারেজে যাবে না, এমন অসুস্থ চিন্তা প্রায়শই দৃশ্যমান। এটাই যেন আমাদের সংস্কৃতির ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় সিটি সার্ভিসের বাসগুলোকে দূরপাল্লার রাস্তায় নামিয়ে চলছে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

অধিক মুনাফালোভী মনোবৃত্তি থেকেই সৃষ্টি হয় এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর অব্যবস্থাপনা। কোন পরিবহন কত বেশি ট্রিপ দিল, তার এক প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কিন্তু পরিবহন বা এর চালকের অধিক ট্রিপ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে ভাববার যেন মন মানসিকতাই নেই। রাস্তায় যে পরিমাণ যাত্রীদের চাপ থাকে, সেই বাস্তবতায় প্রতিটি গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স আর ফিটনেস পরীক্ষা করা যেন এক আকাশকুসুম ভাবনা। অন্যদিকে ফিডার রোড থেকে মেইন রোডে উঠে আসছে গাড়ি,

তারা না মানছে সংকেত, না কমাচ্ছে গতি।

নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে যাত্রী ওঠা বা নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী নামার মতো দায়িত্বশীল আচরণ সচরাচর গোচরীভূত হয় না। যাত্রীকে ব্যস্ত সড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়িতে উঠতে কিংবা নামতে দেখার মতো দুর্লভ চিত্র কেবল বাংলাদেশেই দেখা যায়। এতে করে পরিবহন চালকেরাও রাস্তা থেকে থেমে থেমে যাত্রী ওঠানোর জন্য এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। থেমে থেমে যাত্রী ওঠানোর কারণে অপচয় হওয়া সময়কে সমন্বয় করতে তারা সড়ককে বিমানের রানওয়ে বানিয়ে ফেলে। তারা ভুলে যায় রানওয়ে ভাবা রাস্তাটি কখন যে খানাখন্দে ভরা হাঁটাপথ হয়ে গেছে! তা ছাড়া চালক-যাত্রী অনেকেই গাড়ি চালানো কিংবা রাস্তা পারাপারের সময় দিব্যি মোবাইল ফোনে কথা বলে যান। এতে করেই রাস্তা হয়ে ওঠে এক মরণফাঁদ। এ ছাড়া সড়কে অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচল, চালকের অজ্ঞতা-অদক্ষতা, রাস্তার সংকীর্ণতা, অতিরিক্ত গতি, অহেতুক পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার, ফুটপাতের অবৈধ দখল এবং জনসাধারণের অসচেতনতা ও অসাবধানতার কারণে প্রতিদিন শত শত প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি আর রাস্তাতেই কাটে পরিবহন চালক ও হেলপারের জীবন। রাত গাড়িতেই কাটে, এমন চিত্রও বিরল নয়। এই জীবন আমৃত্যু এভাবেই ছুটে চলে, যেখানে সামাজিকতার কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই ব্যস্ত জীবনের পরিসরে নির্মল আনন্দ নেই, নেই কোনো স্বপ্ন; আছে কেবল নিত্যদিনের চাহিদা আর বেঁচে থাকার যুদ্ধ। শত-সহস্র যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে নিয়ে গেলেও ধন্যবাদ দেওয়ার মতো সৌজন্যবোধ কোনো যাত্রীর মধ্যে দেখা যায় না। এই কর্মব্যস্ততা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, পারিবারিক সময়ের অভাব এবং সামাজিক মূল্যায়নের সংকটের কারণে কিছু কিছু চালক জড়িয়ে পড়ছেন মাদকের জালে। অবহেলা আর অবজ্ঞার কারণে চালকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের মনোভাব তৈরি হচ্ছে না।

প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না। কেবল মুনাফাই মূল কথা নয়, জীবনের নিরাপত্তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি সকলকে উপলব্ধি করতে হবে। তাই সড়কে প্রাণ রক্ষা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়; মালিক, চালক ও যাত্রী সকলকে সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। চালককে তার পরিবহনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা এবং গতির সমন্বয়ের যোগ্যতা ও মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন একজন সুস্থ মানুষ হতে হবে। তাঁদের সম্মান ও মর্যাদার জায়গাটি অনুধাবন করাতে হবে এবং সামাজিক জীবনের সাথে সংযোগ ঘটাতে হবে।

গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একজন ড্রাইভার সপ্তাহে কিংবা দৈনিক কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবেন, তা নির্ধারণ করে দিতে হবে। আমরা সাধারণত দেখতে পাই উন্নত বিশ্বে একজন ড্রাইভার একটানা দিনে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারেন। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আমাদের দেশেও তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে একটি স্মার্ট সিস্টেমে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার থাকবে, যার অধীনে সকল চালক সংযুক্ত থাকবেন। চালক তাঁর ডিউটি শুরুর পূর্বে আঙুল স্ক্যান (Fingerprint) করবেন এবং ডিউটি শেষ করার সময় আবার স্ক্যান করবেন। স্ক্যান না করলে ওই গাড়ি কেন্দ্রীয় ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় সংকেত প্রেরণ করবে। চালকের পাশাপাশি মালিককেও দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে হবে। চালক যেমন ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালাবেন না, ঠিক তেমনি মালিকও লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে তাঁর মূল্যবান সম্পদ হস্তান্তর করবেন না। এক রুটের গাড়ি অন্য রুটে কিংবা স্বল্পপাল্লার গাড়ি দূরপাল্লায় যাতে না চলে, সে বিষয়েও মালিককে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রত্যেক চালককে নিয়োগপত্রের মাধ্যমে চাকরির নিশ্চয়তা দিতে হবে। চাকরির নিশ্চয়তা যেমন তাঁর পরিবহনের প্রতি দায়িত্ব বাড়াবে, তেমনি চালকের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

যাত্রীদেরও চালকের প্রতি আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। চালকের মর্যাদা কিংবা সম্মানের বিষয়ে যাত্রীদের অধিক পরিমাণ সচেতন থাকতে হবে, যাতে তাঁদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া চালকদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ড্রাইভার ও হেলপারদের উন্নত প্রশিক্ষণ, আলাদা পোশাক এবং

কর্মজীবন শেষে মাসিক ভাতা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া যায়। গাড়িতে ওঠার সময় কুশল বিনিময় এবং নামার সময় ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তোলা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে গাড়িতে ওঠা এবং নির্দিষ্ট স্টপেজেই নামার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দুর্ঘটনাকবলিত একটি পরিবার কী ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তা চালকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। “১০ মিনিট আগে পৌঁছানোর চেয়ে ১০ বছর বেশি বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ”। তা বোঝার মতো মানসিক সুস্থতা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি বেশি প্রয়োজন রাস্তার সুস্থতা। দেশের সড়ক-মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে চলছে ধীরগতির যানবাহন, যাদের না আছে রুট পারমিট, না আছে লাইসেন্স। এ সকল বাহনগুলোর মহাসড়কে প্রবেশাধিকার জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হবে। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধে লাইসেন্স এবং রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সর্বোপরি মালিক, চালক ও যাত্রী সকলেই আইন, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার বন্ধনে আবদ্ধ হলেই থামবে উৎসবের কান্না এবং নিশ্চিত হবে নিরাপদ যাত্রা।

লেখক——-
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা