
চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, উন্নত নিরাপত্তা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পতেঙ্গা সৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।
সোমবার (৩০ মার্চ ২০২৬) নগরীর কপার চিমনী রেস্টুরেন্টে মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ)-এর আয়োজনে এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় “পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে পর্যটন পরিষেবার উন্নয়ন” শীর্ষক মতবিনিময় ও অংশীজন সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন এমএএফ চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দীন চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল চট্টগ্রাম রিজিয়নের কনসালটেন্ট সদরুল আমিন।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত চট্টগ্রাম নগরীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সৈকত ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৈকতের দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন পর্যটকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।
সভায় বক্তারা জানান, সরকার ইতোমধ্যে পতেঙ্গা সৈকত এলাকাকে পর্যটন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের সহযোগিতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সিঁড়ি, আধুনিক শৌচাগার, বাগান, ওয়াকওয়ে ও সড়ক বাতি স্থাপন করা হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অবৈধ স্থাপনার কারণে অনেক সুবিধা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বক্তারা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যানজট নিরসন, সমন্বিত পার্কিং ব্যবস্থা, আধুনিক টয়লেট ও বিশ্রামাগার নির্মাণ, নিরাপত্তা জোরদার, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ এবং মানসম্মত খাদ্য ও আবাসন সুবিধা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, পতেঙ্গা সৈকত উন্নয়নে একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তিনি সৈকত এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আনসার সদস্য ও বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দেন এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানান।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে পর্যটকদের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে দোকানপাট স্থাপন এবং জোনভিত্তিক নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের চলাচল সহজ করতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক দৃশ্যের কোনো ক্ষতি না হয়।
তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), টুরিস্ট পুলিশ, পর্যটন কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর “বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি” গঠন করা হবে। যৌথ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সৈকতের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হচ্ছে।
সভায় বক্তাদের দাবির প্রেক্ষিতে মেয়র সৈকতের পে-পার্কিং ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে মত দেন এবং জেলা প্রশাসনকে পুনরায় ইজারা বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সকল সেবা সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে “নগর সরকার” বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সভায় পুলিশ সুপার (টুরিস্ট পুলিশ) উত্তম প্রসাদ পাঠক (পিপিএম), ডিসি ট্রাফিক (পোর্ট) কবির আহমেদ, সহকারী কমিশনার (পর্যটন) সুব্রত হালদার, সিডিএ’র নগর পরিকল্পনাবিদ জহির আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ঊর্মি সরকারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, সাবেক কাউন্সিলর ইসমাইল হোসেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও এমএএফ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এমএএফ-এর সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ মামুনুর রশিদ সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিক নেতারা বক্তব্য রাখেন।
সভা শেষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হবে, যা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত উদ্যোগে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে, যা দেশীয় ও বিদেশি পর্যটকের আগমন বৃদ্ধি করে স্থানীয় অর্থনীতি ও জাতীয় পর্যটন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
Leave a Reply