
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও দেশের আইনি কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।
রবিবার (১২ এপ্রিল ২০২৬) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে “জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ” বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান। এ সময় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। তিনি বলেন, চলতি অধিবেশনে সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং শবে বরাতের দীর্ঘ ছুটির কারণে কার্যদিবস তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সংসদ সচিবালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বিজি প্রেস এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিনরাত পরিশ্রম করে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সমন্বয়ের ফলেই স্বল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো অধ্যাদেশের নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Procedure) অনুযায়ী স্পিকারের বিশেষ এখতিয়ার প্রয়োগের মাধ্যমে বিলগুলো সংসদে উত্থাপন এবং নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এতে করে আইনগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়নি।
তিনি বলেন, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো তখনও গঠিত না হওয়ায় অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি প্রতিটি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান করে এবং সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই সংসদে বিল আকারে সেগুলো উত্থাপন ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ অবিকল অবস্থায় সর্বসম্মতিক্রমে পাসের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ১৬টি অধ্যাদেশ অধিকতর যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার জন্য পরবর্তী অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকি অধ্যাদেশগুলো সংশোধিত আকারে পাস করা হয়েছে অথবা রহিত ও হেফাজতকরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিলের সংখ্যা নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার প্রশ্ন ও ভুল বোঝাবুঝির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী সংসদে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ৯১টি বিলের মধ্যেই বাকি ১৭টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে একটি অধ্যাদেশ জারির পর ১৫-২০ দিন কিংবা এক মাস বা দুই মাস পরে দ্বিতীয় সংশোধনী বা তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু মূল অধ্যাদেশটি একটিই। সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের সময় সংশোধনীসহ সবগুলোকে একত্র করে একটি বিল হিসেবেই উত্থাপন করা হয়েছে।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বিল নিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তিনি বলেন, কিউরেটর নিয়োগ ও পদত্যাগ সংক্রান্ত বিধিগুলো আরও স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী অধিবেশনে আরও আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে বিলটি পুনরায় উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি নিজেও গুমের শিকার। তাই আমরা চাই না তাড়াহুড়ো করে এমন কোনো আইন পাস করা হোক, যাতে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে।”
তিনি বলেন, এসব আইনের কিছু অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে আইনগুলোকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও শক্তিশালী করা হবে, যাতে ভুক্তভোগীদের জন্য সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংসদীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী বিরোধী দল বিধি অনুসারে ওয়াকআউট করতেই পারে। এটি গণতান্ত্রিক চর্চারই একটি অংশ। তবে সংসদের বাইরে গিয়ে যদি অসত্য তথ্য বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করা হয়, তাহলে তা জাতির সামনে পরিষ্কার করা সরকারের দায়িত্ব।
তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার বিরোধী দলীয় সদস্যদের নজিরবিহীনভাবে দীর্ঘ সময় কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন। তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তিগুলোও সংসদের প্রতিবেদনে হুবহু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তারপরও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ওয়াকআউট করা সমীচীন হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদে গঠনমূলক আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
Leave a Reply