
কোতোয়ালী থানায় ওসি জায়েদ নুরের দায়িত্ব গ্রহণ পেশাদার পুলিশিংয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি- পুলিশের পোশাক শুধু একটি সরকারি ইউনিফর্ম নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থার প্রতীক। একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজারো মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি।
ফলে পুলিশি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে কোনো সিদ্ধান্তই সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। কিন্তু একজন প্রকৃত পেশাদার কর্মকর্তা পরিস্থিতির চাপে নয়, আইন ও দায়িত্ববোধের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসনে সম্প্রতি সংঘটিত ওসি রদবদলের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম নিঃসন্দেহে জায়েদ নুর। পটিয়া থানার দায়িত্ব পালনকালে যে কর্মকর্তা নানা বিতর্ক, চাপ ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিলেন, তিনিই চট্টগ্রাম মহানগরের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
এটি নিছক একটি বদলি আদেশ নয়; বরং একজন কর্মকর্তার পেশাগত দক্ষতা, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের প্রতি প্রশাসনের আস্থার প্রকাশ। গত বছরের পটিয়ার ঘটনাটি এখনও অনেকের স্মৃতিতে রয়েছে। একটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় পটিয়া থানা কার্যত একটি সংকটময় অবস্থার মধ্যে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে থানা ঘেরাও, বিক্ষোভ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং প্রশাসনিক চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছিল পুলিশকে। সেই উত্তপ্ত সময়ে ওসি জায়েদ নুরের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—তিনি কি জনতার চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন, নাকি আইনের শাসন ও থানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন? একজন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো আইনগত সীমারেখার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। তিনি ঠিক সেটিই করেছিলেন। থানা, সরকারি সম্পদ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তার সিদ্ধান্ত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে, কিন্তু একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাজ জনপ্রিয়তা অর্জন করা নয়; বরং আইন বাস্তবায়ন করা। পুলিশ প্রশাসনের ভেতরের বাস্তবতা সম্পর্কে যারা জানেন, তারা উপলব্ধি করেন যে অনেক সময় একজন কর্মকর্তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে যেকোনো সিদ্ধান্তই সমালোচনার জন্ম দেয়। পটিয়ার ঘটনাও ছিল তেমনই একটি অধ্যায়। আন্দোলনের তীব্রতা, জনমতের চাপ এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়। অনেকেই তখন এটিকে তার ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, ঘটনাটি ছিল মূলত পরিস্থিতির বাস্তবতা মোকাবিলার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। ইতিহাস বলে, অনেক দক্ষ কর্মকর্তা সাময়িকভাবে সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু পরবর্তীতে তাঁদের যোগ্যতাই তাঁদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছে।
জায়েদ নুরের ক্ষেত্রেও যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বর্তমান কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক ওসি রদবদলের মধ্য দিয়ে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা হলো—যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন হবে বাস্তব কাজের ভিত্তিতে, কোনো সাময়িক বিতর্কের ভিত্তিতে নয়। কোতোয়ালী থানা শুধু একটি থানা নয়; এটি চট্টগ্রাম নগরের প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থল। আদালত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পুরনো নগরীর জনঘনত্ব, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থাপনার কারণে এই থানার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ এবং সংকট মোকাবিলার দক্ষতা। এই ধরনের একটি থানার দায়িত্ব একজন কর্মকর্তার হাতে তুলে দেওয়া মানেই তার প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ আস্থা রয়েছে। জায়েদ নুরের ক্ষেত্রে সেই আস্থার বহিঃপ্রকাশই আমরা দেখতে পাচ্ছি। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, অপরাধ বিশ্লেষণ এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি হলো—একজন কর্মকর্তাকে বিচার করতে হলে তার পুরো কর্মজীবনকে মূল্যায়ন করতে হয়। কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে একজন কর্মকর্তার সততা, দক্ষতা বা যোগ্যতা নির্ধারণ করা যায় না। বরং দেখতে হয় তিনি সংকটের মুহূর্তে কী ভূমিকা পালন করেছেন, আইনের প্রতি কতটা অনুগত থেকেছেন এবং দায়িত্ব পালনে কতটা সাহস দেখিয়েছেন। জায়েদ নুরের ক্ষেত্রে আমি সেই পেশাদার মনোভাবের প্রতিফলনই দেখতে পাই। তিনি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য কাজ করেছেন। আর দায়িত্ব পালনের পথ সবসময় সহজ হয় না। অনেক সময় সেই পথ কণ্টকাকীর্ণ হয়, সমালোচনায় ভরা হয়, এমনকি ব্যক্তিগত মূল্যও দিতে হয়।
কিন্তু প্রকৃত পেশাদাররা সেখানেই নিজেদের প্রমাণ করেন। আজ কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি যেন নতুন করে সেই সুযোগ পেলেন। এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং পুলিশ বাহিনীর ভেতরে কর্মদক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মূল্যায়নের একটি ইতিবাচক উদাহরণ। আমার বিশ্বাস, কোতোয়ালী থানার দায়িত্বে থেকে ওসি জায়েদ নুর তার অভিজ্ঞতা, সততা, সাহসিকতা এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। একই সঙ্গে এই পদায়ন পুলিশ প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তাদের কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে দেবে—সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করলে সাময়িক ঝড় হয়তো আসবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যোগ্যতারই জয় হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি তার যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষদের ওপর নির্ভর করে। পুলিশ বাহিনীও এর ব্যতিক্রম নয়। আর সেই কারণেই কোতোয়ালী থানায় জায়েদ নুরের দায়িত্ব গ্রহণকে আমি শুধু একটি বদলি আদেশ হিসেবে দেখি না; বরং এটি পেশাদার পুলিশিং, দায়িত্ববোধ এবং যোগ্যতার প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করি। সময়ের স্রোতে অনেক বিতর্ক হারিয়ে যায়, অনেক অভিযোগ মুছে যায়; কিন্তু সততা, সাহস এবং দায়িত্বশীলতার ইতিহাস থেকে যায়। কোতোয়ালী থানায় ওসি জায়েদ নুরের নতুন অধ্যায় হয়তো সেই ইতিহাসেরই আরেকটি নতুন পৃষ্ঠা।