চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা সমবায় অফিসার মুহাম্মদ ফারুক আলমের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সমবায়ীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সমবায়ী, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে প্রায় ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে বদলি করা হয়। এ বিষয়ে জেলা সমবায় কার্যালয়, চাঁদপুরের স্মারক নং-১২৪৮, তারিখ ০৬/০৯/২০১৮ এবং ১০/০৬/২০১৮ তারিখে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মতলব উত্তর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে যোগদান করেন। যোগদানের পর মোহনপুর সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কমিটি নির্বাচনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তরের ১০/০২/২০২২ তারিখের ১৭১ নং স্মারকে তাকে চাঁদপুর সদর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রীর ভাগ্নের প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেই বদলি স্থগিত করে পুনরায় মতলব উত্তর উপজেলাতেই বহাল থাকেন।
এদিকে চাঁদপুর-২ আসনের সাবেক এমপি’র ডিও লেটারের মাধ্যমে "উন্নয়ন জাতের গাভী পালনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্প”-এর নীতিমালা পরিবর্তন করে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে লাখ লাখ টাকা বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিতরণ করা এসব অর্থ এখন আর আদায় সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সুবিধাভোগীর প্রকৃত অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে বেনামে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হলেও আজ পর্যন্ত তার এক টাকাও আদায় হয়নি। সংশ্লিষ্ট আদায়কারী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে।
এছাড়াও সিভিডিপি প্রকল্পের গ্রামকর্মীদের সম্মানীর টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে উপজেলা সমবায় অফিসারের বিরুদ্ধে। একাধিক গ্রামকর্মী অভিযোগ করেন, প্রতি মাসে সম্মানী দেওয়ার সময় টাকা কেটে রাখা হতো। এমনকি কাগজে-কলমে ৮ থেকে ১০ জন ভুয়া গ্রামকর্মীর নাম দেখিয়ে তাদের সম্মানীর টাকাও আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন নারী গ্রামকর্মী অভিযোগ করেন, উপজেলা সমবায় অফিসার তাকে বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগতভাবে বিরক্ত করতেন এবং রাতে মুঠোফোনে মেসেজ পাঠাতেন। এমনকি তাকে চাঁদপুরে হোটেলে যাওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ওই গ্রামকর্মী চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার বিভিন্ন সমবায় সমিতির কাছে চাঁদা দাবি করতেন তিনি। চাঁদা না দিলে সমিতির রেজিস্ট্রেশন বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেন সমবায়ীরা। এখলাছপুর আলোকিত সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড ও ছেংগারচর পৌর বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেতৃবৃন্দ তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
গত ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে ছেংগারচর পৌর বণিক সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে ভূয়া ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। সমিতির সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানা যায়।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করায় আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই কর্মকর্তা মতলব উত্তর উপজেলায় বহাল থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা সমবায় অফিসার মুহাম্মদ ফারুক আলম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সব মিথ্যা।